রাজকীয় রূপের মথুরা -সৌরভ মাহমুদ

বিপন্ন পাখি মথুরার অনেক বাস্তব গল্প শুনিয়েছিলেন প্রকৃতিবিদ দ্বিজেনশর্মা। তাঁর ছেলেবেলায় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পাথারিয়া পাহাড় এলাকায়অনেক মথুরা পাখি নাকি চরে বেড়াত। দেশের পাহাড়ি বন এখন ধ্বংসের শেষপ্রান্তে। সঙ্গে যোগ হয়েছে পাহাড়িদের শিকার। দুয়ে মিলে মথুরা অনেক আগেই বনথেকে বিপন্ন পাখির তালিকায় চলে এসেছে। সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ে চা-বাগানসম্প্রসারণ আর প্রাকৃতিক বন উজাড় হওয়ার ফলে সেখানে চিরসবুজ বনের এ পাখিরদেখা পাওয়া এখন নিতান্ত ভাগ্যের ব্যাপার।

সম্প্রতি ঈদের ছুটিতে সেইপাথারিয়া এলাকার বন-জঙ্গলে আট দিন ঘুরেছি। ভাগ্য সহায় ছিল, দেখা হলো ১১টিমথুরা পাখির সঙ্গে। যাদের চারটি ছিল পুরুষ, সাতটি মেয়ে মথুরা। সবচেয়েউল্লেখযোগ্য সময় ছিল গত ২২ নভেম্বর বিকেলটা। ছয়টি মথুরার একটি দল একেবারেযেন রাজকীয় আড্ডায় বসেছিল আমার ক্যামেরার সামনে। হঠাৎ বাদামি কাঠবিড়ালি এসেশব্দ করায় ওরা লুকিয়ে পড়ল পাহাড়ি বনতলে। Continue reading

দুটি বিলেতি গল্প -তারাপদ রায়

প্যারিস শহরের এক রেস্তোরাঁয় বসে সকালে দুই বন্ধু খবরের কাগজ পড়তে পড়তে চা খাচ্ছে। হঠাৎ এক বন্ধুর চোখ খবরের কাগজের এক জায়গায় পড়তে সে আঁতকিয়ে উঠল, সে অন্য বন্ধুকে দেখাল তারপর পড়ে শোনাল। ঘটনাটি সামান্য নয়, মাদাম দুভালের স্বামী মঁশিয়ে দুভাল গতকাল রাতে অতর্কিতে বাড়ি ফিরে এসে তাঁর স্ত্রীকে ঘরের মধ্যে এক অপরিচিত লোকের সঙ্গে দেখতে পান। মঁশিয়ে দুভাল কয়েকদিন আগে লন্ডনে গিয়েছিলেন। কিছুদিন পরে ফেরার কথা ছিল, তাই হয়তো দুভাল-পত্নীর এই অসতর্কতা।

সে যা হোক, দুভাল সাহেব বাড়ি ফিরে সেই হতভাগ্য প্রেমিককে দড়ি দিয়ে জানালার গরাদের সঙ্গে বাঁধেন। তারপর নির্মমভাবে এক ঘণ্টা চাবুক মারেন এবং অবশেষে তাকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে প্যারিস শহরের শীতের বরফজমা, কনকনে ঠান্ডায় রাস্তায় লাথি মেরে বাড়ির মধ্য থেকে বের করে দেন। পুলিশের গাড়ি দুর্ভাগাকে উদ্ধার করে রাস্তা থেকে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। যে বন্ধুটি খবরের কাগজটি অন্য বন্ধুকে পড়ে শোনাচ্ছিল সে বলল, ‘কী সাংঘাতিক! সামান্য অবৈধ প্রেমের জন্য এত লাঞ্ছনা! কী সাংঘাতিক ব্যাপার!যে শুনছিল সেই দ্বিতীয় বন্ধুটি খবর শুনে অনেকক্ষণ গুম হয়ে থেকে বলল, ‘এর চেয়ে আরও সাংঘাতিক হতে পারত।

প্রথম বন্ধু বিস্মিত, ‘এর থেকে আর কী সাংঘাতিক হবে!দ্বিতীয় বন্ধুটি বলল, ‘কাল না হয়ে পরশু দিন হলেই আরও সাংঘাতিক হতো। পরশু দিন রাতে যে আমি ছিলাম দুভালমেমের বাড়িতে, সেদিন যদি দুভাল ফিরত!
দ্বিতীয় কথিকাটি বিপরীতমুখী। আগের গল্পের স্বামী মারমুখী। আর এ গল্পে ভীরু, ভালো মানুষ স্বামী তাদের একজন যারা বউকে দখলে রাখতে পারে না, সাহেবরা যাদের শিং গজিয়েছে বলে উপহাস করে।
এক ব্যক্তির অফিসে খুব ক্লান্ত লাগছে। অথচ অফিস ছুটি হতে এখনো তিন-চার ঘণ্টা বাকি। এখন ভরদুপুর। তার সাহসের অভাব, অফিস থেকে পালাতে ভরসা করছে না। তার সহকর্মী তাকে বলল, ‘আরে, ভয়ের কী আছে, আজ তো বড়সাহেব অফিসে নেই। খুব সাজগোজ করে, ভুরভুরে আতর মেখে বেরিয়েছে। কোথাও ফুর্তি করতে গেছে, সহজে ফিরবে না। তুমি বাড়ি চলে যাও, কেউ তোমাকে ধরবে না।
ক্লান্ত কর্মচারীটি সংশয়াকুল চিত্তে গৃহপানে রওনা হলো। তার বাড়ি কাছেই। ১৫ মিনিটের মধ্যে দেখা গেল সে পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে অফিসে ফিরে আসছে। সে ফিরে এসে হাঁপাতে লাগল। একটু বিশ্রাম নেওয়ার পর তার পূর্ব পরামর্শদাতা তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি এমন ভয় পেয়ে ফিরে এলে কেন?’
কর্মচারীটি বলল, ‘তোমার পরামর্শ শুনে আজ আমি ঘোর বিপদে পড়েছিলাম।
কী বিপদ?’ কিছুই বুঝতে পারছে না পূর্ব পরামর্শদাতা।
কী বিপদ?’ অফিস কেটে চলে যাওয়া বন্ধুটি ব্যাখ্যা করে বলল, ‘চাকরি যেতে বসেছিল। আজ চাকরি খোয়াতাম। বড় সাহেবের কাছে অল্পের জন্য ধরা পড়িনি যে অফিস পালিয়েছিলাম।
পরামর্শদাতা পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘তার মানে?’
বন্ধুটি বলল, ‘তার মানে? বাড়ি ফিরে শোয়ার ঘরে ঢুকতে যাচ্ছি, হঠাৎ শুনি বউ কার সঙ্গে খুব হেসে হেসে কথা বলছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখি, বড় সাহেব আমার বিছানায় শুয়ে। ভাগ্যিস হুড়মুড় করে ঘরের মধ্যে ঢুকে যাইনি। তাহলেই ধরা পড়ে যেতাম। অফিস পালানো ধরতে পারলে সাহেব নিশ্চয়ই আমাকে বরখাস্ত করত। সেই ভয়েই তো একছুটে ফিরে এলাম অফিসে।
বায়রন সাহেবের বেশ কিছুকাল আগে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার নামে এক নাট্যকার অত্যন্ত অনাসক্তভাবে পরকীয়া সম্পর্কে দু-চার হাজার কথা লিখেছিলেন। শেক্সপিয়ারের মতো হূদয়সন্ধানী মানুষকে অনাসক্ত বলছি এ কারণে যে তিনি নিজের সঙ্গে নিজেরই বিরোধ ঘটিয়েছেন।
তারাপদ রায়: সাহিত্যিক, রম্য লেখক হিসেবে খ্যাত। জন্ম ১৯৩৬, মৃত্যু ২০০৭।

চরমপত্র -এম আর আখতার মুকুল

মেজিক কারবার। ঢাকায় অখন মেজিক কারবার চলতাছে। চাইরো মুড়ার থনে গাবুর বাড়ি আর কেচ্কা মাইর খাইয়া ভোমা ভোমা সাইজের মছুয়া সোলজারগুলা তেজগাঁ-কুর্মিটোলায় আইস্যাআ-আ-আ দম ফালাইতাছে। আর সমানে হিসাবপত্র তৈরি হইতাছে। তোমরা কেডা? ও-অ-অ টাঙ্গাইল থাইক্যা আইছো বুঝি? কতজন ফেরত আইছো? অ্যাঃ ৭২ জন। কেতাবের মাইদে তো দেখতাছি লেখা রইছে টাঙ্গাইলে দেড় হাজার পোস্টিং আছিলো। ব্যস, ব্যস, আর কইতে হইব নাবুইজ্যা ফালাইছি। কাদেরিয়া বাহিনী বুঝি বাকিগুলার হেই কারবার কইর্যা ফালাইছে। এইডা কী? তোমরা মাত্র ১১০ জন কীর লাইগ্যা? তোমরা কতজন আছলা? খাড়াও খাড়াওএই যে পাইছি। ভৈরব১২৫০ জন। তা হইলে ১১৪০ জনের ইন্না লিল্লাহে ডট ডট ডট রাজিউন হইয়া গেছে। হউক, কোনো খেতি নাই। কামানের খোরাকের লাইগ্যাই এইগুলারে বঙ্গাল মুলুকে আনা হইছিল। রংপুর-দিনাজপুর, বগড়া-পাবনা মানে কি না বড় গাংয়ের উত্তর মুড়ার মছুয়া মহারাজগো কোনো খবর নাইক্যা। হেই সব এলাকায় এক শতে এক শর কারবার হইছে। আজরাইল ফেরেশতা খালি কোম্পানির হিসাবে নাম লিখ্যা থুইছে।

আরে, এইগুলা কারা? যশুরা কই মাছের মতো চেহারা হইছে কীর লাইগ্যা? ও-অ-তোমরা বুঝি যশোর থাইক্যা ১৫৬ মাইল দৌড়াইয়া ভাগোয়াট হওনের গতিকে এই রকম লেড়-লেড়া হইয়া গেছো।

আহ্ হাঃ! তুমি একা খাড়াইয়া আছো কীর লাইগ্যা? কী কইল্যা? তুমি বুঝি মীরকাদিমের মাল? ও-অ-অ-অ বাকি হগ্গলগুলারে বুঝি বিচ্চুরা মেরামত করছে? গাংয়ের পাড়ে আলাদা না পাইয়া, আরামসে বুঝি চুবানি মারছে।

কেইসডা কী? আমাগো বকশি বাজারের ছক্কু মিয়া কান্দে কীর লাইগ্যা? ছক্কু-উ, ও ছক্কু! কান্দিস না ছক্কু, কান্দিস না! কইছিলাম না, বঙ্গাল মুলুকের কোদো আর প্যাঁকের মাইদ্দে মছুয়াগো মউত তেরা পুকর তা হ্যায়।

নাঃতখন কী চোট্পাট! হ্যান করেংগা, ত্যান করেংগা। আর অহন? অহন তো মওলবি সাবরা কপিকলের মাইদ্দে পড়ছে। সামনে বিচ্চু, পিছনে বিচ্চু, ডাইনে বিচ্চু, বাঁয়ে বিচ্চু। অহন খালি মছুয়ারা চিল্লাইতাছে, ‘ইডা হামি কী করছুনুরে! হামি ক্যা নানির বাড়িত আচ্ছিনু রে! হামি ইয়া কী করনু রে!

আত্কা আমাগো ছক্কু মিয়া কইল, ভাইসাব আমার বুকটা ফাইট্যা খালি কান্দন আইতাছে। ডাইনা মুড়া চাইয়া দেহেন। ওইগুলা কী খাড়াইয়া রইছে। কী লজ্জা! কী লজ্জা! মাথাডা অ্যাঙ্গেল কইরা তেরছি নজর মারতে দেহি কি, শও কয়েক মছুয়া অক্করে চাউয়ার বাপমানে কি না দিগম্বর সাধু হইয়া খাড়াইয়া রইছে। ব্রিগেডিয়া বশীর জিগাইলো, ‘তুম লোগেকা কাপড়া কিধার গিয়া?’ জবাব আইলোযশোরে সার্ট, মাগুরায় গেঞ্জি, গোয়ালন্দে ফুলপ্যান্ট আর আরিচায় আন্ডারওয়ার থুইয়া বাকি রাস্তা খালি চিল্লাইতে চিল্লাইতে আইছি, ‘হায়, ইয়াহিয়া, ইয়ে তুমনে কেয়া কিয়া?—হামলোগ তো আভি নাংগা মছুয়া বন গিয়া।

আত্কা ঠাস ঠাস কইরা আওয়াজ হইলো। ডরাইয়েন না, ডরাইয়েন না! মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী চুলে ভর্তি সিনা চাব্ড়াইতে শুরু করছে। পদ্মা নদীর কূলে আমার নানা মরেছে, পদ্মা নদীর কূলে আমার নানি মরেছেগাবুর বাড়ির চোটে আমার কাম সেরেছে।ব্যস, মওলবি রাও ফরমান আলী জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উথান্টের কাছে খবর পাডাইল, ‘হে প্রভু, তোমার দিলে যদি আমাগো লাইগ্যা কোনো রকম মহব্বত থাইক্যা থাকে, তা হইলে তুরন্দ আমাগো কইয়া দাও; কীভাবে বিচ্চু আর হিন্দুস্তানি ফোর্সের পা জাপটাইয়া ধরলে আমার লেডুলেড়া আর ধ্বজভঙ্গ মার্কা বাকি সোলজারগো জানডা বাঁচানো সম্ভব হইব।

এই খবর না পাইয়া একদিকে জেনারেল পিঁয়াজি আর একদিকে সেনাপতি ইয়াহিয়া কী রাগ? সেনাপতি ইয়াহিয়া লগে লগে উথান্টের কাছে টেলিগ্রাম করাল, ‘ভাই উথান্ট, ফরমাইন্যার মাথা খারাপ হওনের গতিকেই এই রকম কারবার করছে। হের টেলিগ্রামটা চাপিশ কইর্যা ফালাও।এইদিকে আমি ছ্যার শাহ নেওয়াজ ভুট্টোর ডাউটফুলপোলা, পোংটা সরদার জুলফিকার আলী ভুট্টোরে মিছা কথা কওনের ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করনের লাইগ্যা জাতিসংঘে পাডাইতাছি। পোলডারে একটুক্ নজরে রাখ্বা। বেডার আবার সাদা চামড়ার কসবিগো লগে এথি-ওথি কারবার করনের খুবই খায়েশ রইছে।

সাবে কইছে, কিসের ভাই, আহ্লাদের আর সীমা নাই। সেনাপতি ইয়াহিয়া খানের হবু ফরিন মিনিস্টার জুলফিকার আলী ভুট্টো ব্রাকেটে শপথ লওনের টাইম হয় নাইক্যাব্র্যাকেট শেষ। জাতিসংঘে যাইয়া পয়লা রিপোর্টারগো লগে বেশ কায়দা কইর্যা লুকোচুরি খেলতে শুরু করল। তারপর। জাতিসংঘের ডায়াসে আতকা কয়েক দফায় কান ধইর্যা উঠ-বস’, ‘উঠ-বসকইর্যা ভুট্টো সাবে ছিল্লাইয়া কইল, ‘আর লাইফের এই রকম কাম করুম না। বঙ্গাল মুলুকে আমরা গেন্জাম কইর্যা খুবই ভুল করছি। আমরা মাফ চাইতাছি, তোওবা করতাছি, কান ডলা খাইতাছি। আমাগো এইবারের মতো খেমা কইর্যা দেন।

কিন্তু ভুট্টো সাব। বহুত লেইট কইর্যা ফালাইছেন। এইসব ভোগাচ কাথাবার্তায় আর কাম হইব না। আতকা ঠাস ঠাস কইর্যা আওয়াজ হইল। কী হইল? কী হইল? জাতিসংঘে ভেটো মাইর্যা সোবিয়েত রাশিয়া হগ্গল মিচ্কি শয়তানরে চিত কইর্যা ফালাইছে। কইছে, ফাইজলামির আর জায়গা পাও না? বাঙালি পোলাপান বিচ্চুরা যহন লাড়াইতে ধনা-ধন্ জিত্তাছে, তহন বুঝি লাড়াই বন্ধু করনের নানা কিসিমের ট্রিকস হইতাছেনা?

এইদিকে সেনাপতি ইয়াহিয়া খানের পরানের পরান জানের জান চাচা নিক্সন, কড়া কিসিমের ট্রিক্স করনের লাইগ্যা সপ্তম নৌবহররে সিঙ্গাপুরে আনছে। লগে লগে ক্রেমলিন থাইক্যা হোয়াইট হাউসরে অ্যাডভাইসিং করছেএকটুক হিসাব কইর্যা কাজ কারবার কইরেন। প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি কইছে, ভারত উপমহাদেশে বাইরের কেউ নাক না গলালেই ভালো হয়। ব্যা-স-স, আমেরিকার সপ্তম নৌবহর সিঙ্গাপুরে আইস্যা নিল-ডাউন হইয়া রইল।

অ্যাঁ, অ্যাঁঃ! এই দিককার কারবার হুনছেননি? হারাধনের একটা ছেলে কান্দে ভেউ ভেউ, হেইডা গেল গাধার মাইদ্দে রইল না আর কেউ। জেনারেল পিঁয়াজি সাবে সরাবন তহুরা দিয়া গোসল কইর্যা ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের মাইদ্দে হান্দাইয়া এখনো চ্যাঁ চ্যাঁ করতাছে, ‘আমার ফোর্স ছেরাবেরা হইলে কী হইব, আমি পাইট করুমআমি পাইট করুম।

আমাগো মেরহামত মিয়া আতকা চিল্লাইয়া উঠল। এইডা কী? এইডা কী? জেনারেল পিঁয়াজি সাবের ফুল প্যান্টের দুই রকম রং দেখতাছি কীর লাইগ্যা? সামনের দিকে খাকি রং, পেছনের মুড়া বাসন্তী রংকেইসডা কী? অনেক দেমাক লাগাইলে এর মাজমাডা বোঝন যায়।
হেইর লাইগ্যা কইছিলাম। মেজিক কারবার। ঢাকায় অহন মেজিক কারবার চলতাছে। চাইরো মুড়ার থনে গাবুর বাড়ি আর কেচ্কা মাইর খাইয়া ভোমা ভোমা সাইজের মছুয়া সোলজারগুলা তেজগাঁ-কুর্মিটোলায় আইস্যাআঁ-আঁ-আঁ, দম ফাইলাইতাছে।

এম আর আখতার মুকুল: সাংবাদিক ও লেখক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত সাড়া জাগানো চরমপত্রঅনুষ্ঠানের পরিচালক, লেখক ও কথক ছিলেন।

সোনাগুই -সৌরভ মাহমুদ

সোনাগুই আমাদের গুইসাপ প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে দুর্লভদর্শন প্রাণী। আমাদের দেশের একটি বিপন্ন বন্য প্রাণীও বটে। বৈজ্ঞানিক নাম Varanus flavescens| বসবাসের জায়গা কমে যাওয়ায় এবং শিকারিদের কারণে এদের সংখ্যা ব্যাপক হারে কমছে। বসতবাড়ির আশপাশে তেমন চোখে পড়ে না। ছোটখাটো ঝোপঝাড়পূর্ণ এলাকায় জলাশয়ের কাছে এদের কদাচিৎ দেখা যায়। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই লুকিয়ে পড়ে। কালো কিংবা রামগাদি গুইসাপের মতো তেড়ে আসে না।
কয়েক মাস আগে কুষ্টিয়া শহর থেকে রাজবাড়ীর পাংশায় যাওয়ার পথে গড়াই নদীর কাছাকাছি মহাসড়কের একটি পরিত্যক্ত পানিপূর্ণ ধানখেতে হলুদাভ একটি গুইসাপকে সাঁতার কাটতে দেখি। তৎক্ষণাৎ গাড়ি থেকে নেমে ধানখেতের কাছে যেতেই দেখা মিলল আরও একটির। যত কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করি, গুইসাপ দুটি সাঁতরে ও ডুব দিয়ে দূরে চলে যেতে থাকে। একসময় রাস্তার ধারের গুল্মঝোপে লুকিয়ে পড়ে।
 
গত বছর নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার গোলামখালী নদীর কাছে চানপুর গ্রামে গিয়ে যে দুটি সোনাগুইয়ের দেখা পেয়েছিলাম, তাদের আচরণের বৈশিষ্ট্যও এমনই ছিল। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে রাস্তার ধারের একটি জলাশয়ের কাছের একটি গর্তের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল। ব্যাপক কোনো গবেষণা না হওয়ায় দেশে এদের বিস্তার সম্পর্কে তেমন বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফ্লোরা অ্যান্ড ফনা অব বাংলাদেশ গ্রন্থে বলা হয়েছে, প্রধানত সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনে এদের দেখা যায়।
 
 সোনাগুইয়ের দেহের বর্ণ হলুদাভ হওয়ায় এদের ইংরেজি নামকরণ হয়েছে Yellow Monitor দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৮ সেন্টিমিটার। মাথার অংশ ছোট, শিরযুক্ত। চোয়াল বেশ ভোঁতা।
শামুক, পোকামাকড়, পাখি ও পাখির ডিম, কচ্ছপের ডিম, মাছ এদের খাদ্যতালিকায় উল্লেখযোগ্য পদ। পরিত্যক্ত জলাশয়, বিল, বড় পুকুর ও নদীর তীরবর্তী এলাকায় বিচরণ করে। বসবাস করে কাছাকাছি কোনো গর্তে। কখনো-সখনো বড় গাছের গুঁড়ির মধ্যেও থাকে। এরা দারুণ সাঁতারু। গাছ বাইতেও পারে দ্রুত। প্রজননকাল জুন-জুলাই। 

সূত্রঃ প্রথম আলো; ১২-১২-২০১০
লেখকঃ সৌরভ মাহমুদ; বাংলাদেশের বিখ্যাত পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক।

পুষ্প ধনু -সৈয়দ মুজতবা আলী

রস কি? অর্থাৎ যখন কোনো উত্তম ছবি দেখি, কিংবা সরেস সঙ্গীত শুনি, অথবা ভালো কবিতা পড়ি, কিংবা নটরাজের মূর্তি দেখি, তখন যে রসানুভূতি হয় সে রস কি, এবং সৃষ্ট হয় কি প্রকারে?

এ রসের কাছাকাছি একাধিক রস আছে। গোয়েন্দা কাহিনী পড়ে, ধাঁধার উত্তর বের করে, মনোরম সূর্যোদয় দেখে, প্রিয়াকে আলিঙ্গন করে যে সব রসের সৃষ্টি হয় তার সঙ্গে যে পূর্বোল্লিখিত রসের কোনোই মিল নেই সে কথা জোর করে বলা চলে না। এমনকিশোনা কথাবার্ট্রান্ড রাস্ল্ নাকি বলেছেন গণিতের কঠিন সমস্যা সমাধান করে তিনি যে আনন্দ অনুভব করেন সেটি নাকি হুবহু কলারসের মতই। কিন্তু এ-সব রসে এবং অন্যান্য রসে পার্থক্য কি সে আলোচনায় এবেলা মেতে উঠলে ওপারে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। আমার জ্ঞানও অতিশয় সীমাবদ্ধ, প্রকাশশক্তি ততোধিক সীমাবদ্ধ। (তা হলে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে, আমি আদৌ লিখতে যাচ্ছি কেন? উত্তরে সবিনয় নিবেদন, বহুদিন সাহিত্য রচনা করার ফলে আমার একটি নিজস্ব পাঠকগোষ্ঠী জমায়েৎ হয়েছেন; এঁদের কেউই পণ্ডিত ননআমিও নইঅথচ মাঝে-মধ্যে এঁরা কঠিন বস্তুও সহজে বুঝে নিতে চান এবং সে কর্ম আমার মত বে পেশাদারীনন-প্রফেশনালইকরতে পারে ভালো। রচনার গোড়াতেই এতখানি ব্যক্তিগত সাফাই হয়তো ঠিক মানানসই হল না তবু পণ্ডিতজন পাছে আমার উপর অহমিকা দোষ আরোপণ করেন তাই সভয়ে এ কটি কথা কইতে হল)।

রস কি, সে আলোচনা অল্প লোকই করে থাকেন। আলঙ্কারিকের অভাব প্রায় সর্বত্রই। কারণ রসের প্রধান কার্যকারণ আলোচনা করতে হলে অন্ততঃ দুটি জিনিসের প্রয়োজন। একদিক দিয়ে রসবোধ, অন্যদিক দিয়ে রসকষহীন বিচার বিবেচনা যুক্তিতর্ক করার ক্ষমতা। তাই এর ভিতর একটা দ্বন্দ্ব লুকনো রয়েছে। যারা রসগ্রহণে তৎপর তারা তর্কের কিচিরমিচির পছন্দ করে না, আর যারা সর্বক্ষণ তর্ক করতে ভালোবাসে তারা যে শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্টতি অগ্রেহয়ে রসিকজনের ভীতির সঞ্চার করে সে তো জানা কথা।
সৌভাগ্যক্রমে এদেশে কিন্তু কখনো আলঙ্কারিকের অনটন হয় নি। ভরত থেকে আরম্ভ করে দণ্ডিন মম্মট ভামহ হেমচন্দ্র, অভিনব গুপ্ত ইত্যাদি ইত্যাদি অন্তহীন নির্ঘন্ট বিশ্বজনের প্রচুর ঈর্ষার সৃষ্টি করেছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মুখে শুনেছি, তাঁকে যখন রাস্ল্ প্রশ্ন শোধান, রস কিহোয়াট্ ইজ আর্ট, তখন তিনি এঁদের স্মরণে রাস্লেক প্রচুর নূতুন তত্ত্ব শোনান। অন্য লোকের মুখে শুনেছি, রাস্ল্ রীতিমত হকচকিয়ে যান।

বিদেশী আলঙ্কারিকদের ভিতর জর্মন কবি হাইনরিষ হাইনের নাম কেউ বড়ো একটা করে না। কারণ তিনি অমিশ্র অলঙ্কার নিয়ে আলোচনা করেন নি। জর্মন কবিদের নিয়ে আলোচনা করার সময় মাঝে মাঝে রস কি তাই নিয়ে তিনি চিন্তা করেছেন এবং রস কি তার সংজ্ঞা না দিয়ে তুলনার মারফৎ, গল্পছলে সব কিছু অতি মনোরম ভাষায় প্রকাশ করেছেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণ যে-রকম কোনো কিছু বলতে গেলে সংজ্ঞা নিয়ে মাথা-ফাটাফাটি না করে গল্প বলে জিনিসটা সরল করে দিতেন অনেকটা সেইরকম।

বাগদাদের শাহ্ইন-শাহ্ দীনদুনিয়ার মালিক খলিফা হারুণ-অর্-রশীদের হারেমের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী, খলিফার জিগরের টুকরো, চোখের রোশনী রাজকুমারীটি ছিলেন স্বপ্নচারিণী’, অর্থাৎ ঘুমের ঘোরে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতেন!

গভীর নিশীথে একদা তিনি নিদ্রার আবেশে মৃদু পদসঞ্চারণে চলে গিয়েছেন। প্রাসাদ উদ্যানে। সখীরা গেছেন পিছনে। রাজকুমারী নিদ্রার ঘোরে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে সম্পূর্ণ মোহাবস্থায় ফুল আর লতাপাতা কুড়োতে আরম্ভ করলেন আর মোহাবস্থায়ই সেগুলো অপূর্ব সমাবেশে সাজিয়ে বানালেন একটি তোড়া। আর সে সামঞ্জস্যে প্রকাশিত হয়ে গেল একটি নবীন বাণী, নতুন ভাষা। মোহাবস্থায়ই রাজকুমারী তোড়াটি পালঙ্কের সিথানে রেখে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়লেন।

ঘুম ভাঙতে রাজকুমারী দেখেন একটি তোড়া যেন তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদুমৃদু হাসছে। সখীরা বললেন, ইটি তাঁরই হাতে তৈরী। কিছুতেই তাঁর বিশ্বাস হয় না। এমন কি ফুলপাতার সামঞ্জস্যে যে ভাষা যে বাণী প্রকাশ পেয়েছে সেটিও তিনি সম্পূর্ণ বুঝতে পারছেন নাআবছা আবছা ঠেকছে।

কিন্তু অপূর্ব সেই পুষ্পস্তবক। এটি তা হলে কাকে দেওয়া যায়? যাঁকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন। খলিফা হারুণ-অর্-রশীদ। খোজাকে ডেকে বললেন, ‘বৎস, এটি তুমি আর্যপুত্রকে (খলিফাকে) দিয়ে এসো।

খোজা তোড়াটি হাতে নিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললে, ‘ও হো হো, কী অপূর্ব কুসুমগুচ্ছ। কী সুন্দর গন্ধ, কী সুন্দর রঙ। হয় না, হয় না, এ রকম সঞ্চয়ন সমাবেশ আর কোনো হাতে হতে পারে না।

কিন্তু সে সামঞ্জস্যে যে বাণী প্রকাশিত হয়েছিল সে সেটি বুঝতে পারল না সখীরাও বুঝতে পারেন নি।

খলিফা কিন্তু দেখা মাত্রই বাণীটি বুঝে গেলেন। তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে গেল। দেহ শিহরিত হল। সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হল। অভূতপূর্ব পুলকে দীর্ঘ দাড়ি বয়ে দরদর ধারে আনন্দাশ্রু বইতে লাগল।

এতখানি গল্প বলার পর কবি হইনরিষ হাইনে বলছেন, ‘হায় আমি বাগদাদের খলিফা নই, আমি মহাপুরুষের বংশধর নই, আমার হাতে রাজা সলমনের আঙটি নেই, যেটি আঙুলে থাকলে সর্বভাষা, এমন কি পশুপক্ষীর কথাও বোঝা যায়, আমার লম্বা দাড়িও নেই, কিন্তু পেরেছি, আমিও সে ভাষা সে বাণী বুঝতে পেরেছি।

এ স্থলে গল্পটির দীর্ঘ টীকার প্রয়োজন। কিন্তু পূর্বেই নিবেদন করেছি সে শক্তি আমার নেই। তাই টাপেটোপে ঠারেঠোরে কই।

রাজকুমারী = কবি ; ফুলের তোড়া = কবিতা ; ফুলের রঙ পাতার বাহার = তুলনা অনুপ্রাস ; খোজা = প্রকাশ-সম্পাদক-ফিলিমডিস্ট্রিব্যুটর (তাঁরা সুগন্ধ সুবর্ণের রসাস্বাদ করতে পারেন, কিন্তু বাণীটি বোঝেন না) ; এবং খলিফা = সহূদয় পাঠক।
 
সৈয়দ মুজতবা আলী: বাংলা সাহিত্যের অন্যতম রম্যরচয়িতা। পঞ্চতন্ত্র ও ময়ূরকণ্ঠী তাঁর অন্যতম রম্যরচনা। জন্ম ১৯০৪ সালে ও মৃত্যু ১৯৭৪ সালে।

শাকসবজি কীভাবে কীটনাশকমুক্ত করবেন? – আব্দুল কাইয়ুম

খাদ্যে ভেজাল এক বড় সমস্যা। শুধু তা-ই নয়, শাকসবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হয় এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব দূর হতে যতটা সময় দরকার, তার আগেই সেগুলো বাজারে নিয়ে আসা হয়, আমরা তা কিনে খাই। অর্থাৎ টাকা দিয়ে আমরা অনেক সময় বিষ কিনি।
এই অভিশাপ থেকে বাঁচার একটি উপায় হলো রান্নার আগে কলের পানিতে ভালোভাবে শাকসবজি ধুয়ে নেওয়া। সাধারণভাবে ধোয়া হয়, কিন্তু কলের পানি জোরে ছেড়ে অথবা পাত্রের পানিতে কিছুক্ষণ ঘষে ধুয়ে নিলে কীটনাশক ও অন্যান্য জীবাণু অনেকাংশে দূর করা যায়। 
কয়েক বছর আগে কানেকটিকাট এগ্রিকালচারাল এক্সপেরিমেন্ট স্টেশনে কৃষিবিজ্ঞানীরা লেটুসপাতা, স্ট্রবেরি ও টমেটোর ১৯৬টি নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করেন। এগুলোর এক অংশ কলের পানিতে এক মিনিট ধোয়া হয় ও অপর অংশ এক শতাংশ পালমোলিভ সলিউশনে ধোয়া হয়। দেখা গেছে, পানিতে ধোয়া সবজিতে ১২টি কীটনাশকের অবশেষের মধ্যে নয়টি উল্লেখযোগ্যভাবে অপসারিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, একে সাবানে ধোয়ার মতোই কার্যকর বলা চলে। এখানে কতক্ষণ ধোয়া হয়েছে সেটা আসল ব্যাপার না, কলের পানির নিচে পাতা বা সবজি ঘষে ঘষে ধোয়া হয়েছে কি না, সেটাই মূল ব্যাপার। 
শাকসবজিতে কীটনাশক ব্যবহারের পর অন্তত তিন সপ্তাহ সময় পার না হলে তা বাজারে বিক্রি করার নিয়ম নেই। কিন্তু এটা ঠিকভাবে মেনে চলে না অনেকেই। আর অনেকে তো এটা জানেই না। আজকাল রাসায়নিক সার বা ওষুধ ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক সার ও কীটনাশক পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে শাকসবজি উৎপাদনের উদ্যোগ বাড়ছে। 
যেমন, বেগুনে খুব বেশি পোকা ধরে, জন্য ব্যাপক হারে কীটনাশক ব্যবহার না করে ফেরোমিন ফাঁদ ব্যবহার করা যায়। বেগুনগাছে চুলার ছাইও ভালো ওষুধ। নিমের পাতা সেদ্ধ পানি ছিটিয়ে পোকা দমন করার পদ্ধতি অনেক আগে থেকেই আমাদের কৃষিতে প্রচলিত। মাটিতে গোবরের সার বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবে উৎপাদিত অরগানিকশাকসবজি ও খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু অরগানিক পণ্য কতটা সততার সঙ্গে উৎপাদন করা হয়েছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই পানিতে ঘষে-মেজে ধুয়ে নেওয়াই শ্রেয়।

সূত্রঃ প্রথম আলো, তারিখ: ০৪-১২-২০১০, লেখকঃ আব্দুল কাইয়ুম

মেয়েদের জামার বোতাম বাঁ পাশে কেন? -আব্দুল কাইয়ুম

সবাই বলবেন, ছেলে আর মেয়েদের জামার মধ্যে পার্থক্য থাকবে না? কিন্তু জামার ডিজাইন থেকেই তো পার্থক্য ধরা যায়, বোতাম বাম-ডান করার কী দরকার? তখন প্রশ্ন উঠবে, মেয়েদেরও তো শার্ট থাকে এবং সেটা যে ছেলেদের না, তা বোঝানোর জন্য কি বোতামসজ্জা দুই রকম হওয়া দরকার না? হয়তো দরকার। কিন্তু এর চেয়েও ভালো ব্যাখ্যা রয়েছে। 
পোশাকে বোতামের প্রথম প্রচলন হয় সেই আদি যুগে, যখন ছেলেরা যুদ্ধ-বিগ্রহে ব্যস্ত থাকত। যুদ্ধের পোশাকে ডান পাশে বোতাম লাগানোর উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষের ডান হাতে থাকা তলোয়ার বা বর্শা যেন জামার ফাঁকে আটকে হেঁচকা টানে তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে ফেলে দিতে না পারে। সাধারণত বাঁ হাতে থাকে আত্মরক্ষার জন্য ঢাল, আর ডান হাতে আক্রমণের জন্য তলোয়ার। ডান পাশে বোতাম থাকলে জামার বাম পাশটা থাকে মসৃণ, ফলে মুখোমুখি যুদ্ধে সুবিধা হয়। আবার যুদ্ধরত অবস্থায় যদি জামার বোতাম খুলতে হয়, তাহলে ডান হাতে তলোয়ার ধরে রেখে বাম হাতে তা করা সম্ভব। 
এখন প্রশ্ন হলো মেয়েদের বোতাম কেন জামার বাম পাশে? এর একটি কারণ হতে পারে এই যে মধ্যযুগে যখন জামায় বোতামের প্রচলন হয়, তখন অভিজাত পরিবারে মা অথবা পরিচারিকা মেয়েদের জামা পরিয়ে দিতেন। জামার বাঁ পাশে বোতাম থাকলে এতে সুবিধা। আর ছেলেরা নিজেদের জামা নিজেরাই পরত, তাই তাদের জন্য জামার ডান পাশে বোতাম থাকলেই সুবিধা। মেয়েদের জামার বাঁ পাশে বোতাম থাকার আরেকটি ব্যাখ্যা রয়েছে। সেটি হলো মায়ের মনস্তত্ত্ব। মা চায় শিশুকে হূদয়ের (হার্ট) সবচেয়ে কাছাকাছি রেখে বুকের দুধ খাওয়াতে। সে জন্য জামার বাঁ পাশে বোতাম থাকলে সুবিধা। 
সাধারণভাবে বলা যায়, ছেলেদের জামার বোতামসজ্জা এসেছে রণাঙ্গনের প্রয়োজনে, আর মেয়েদের জামার ক্ষেত্রে পারিবারিক ও মায়ের প্রয়োজন প্রাধান্য পেয়েছে। এই ঐতিহ্যের ধারা এখনো চলছে।
প্রথম আলো – তারিখ: ০৬-১২-২০১০