চরমপত্র -এম আর আখতার মুকুল

মেজিক কারবার। ঢাকায় অখন মেজিক কারবার চলতাছে। চাইরো মুড়ার থনে গাবুর বাড়ি আর কেচ্কা মাইর খাইয়া ভোমা ভোমা সাইজের মছুয়া সোলজারগুলা তেজগাঁ-কুর্মিটোলায় আইস্যাআ-আ-আ দম ফালাইতাছে। আর সমানে হিসাবপত্র তৈরি হইতাছে। তোমরা কেডা? ও-অ-অ টাঙ্গাইল থাইক্যা আইছো বুঝি? কতজন ফেরত আইছো? অ্যাঃ ৭২ জন। কেতাবের মাইদে তো দেখতাছি লেখা রইছে টাঙ্গাইলে দেড় হাজার পোস্টিং আছিলো। ব্যস, ব্যস, আর কইতে হইব নাবুইজ্যা ফালাইছি। কাদেরিয়া বাহিনী বুঝি বাকিগুলার হেই কারবার কইর্যা ফালাইছে। এইডা কী? তোমরা মাত্র ১১০ জন কীর লাইগ্যা? তোমরা কতজন আছলা? খাড়াও খাড়াওএই যে পাইছি। ভৈরব১২৫০ জন। তা হইলে ১১৪০ জনের ইন্না লিল্লাহে ডট ডট ডট রাজিউন হইয়া গেছে। হউক, কোনো খেতি নাই। কামানের খোরাকের লাইগ্যাই এইগুলারে বঙ্গাল মুলুকে আনা হইছিল। রংপুর-দিনাজপুর, বগড়া-পাবনা মানে কি না বড় গাংয়ের উত্তর মুড়ার মছুয়া মহারাজগো কোনো খবর নাইক্যা। হেই সব এলাকায় এক শতে এক শর কারবার হইছে। আজরাইল ফেরেশতা খালি কোম্পানির হিসাবে নাম লিখ্যা থুইছে।

আরে, এইগুলা কারা? যশুরা কই মাছের মতো চেহারা হইছে কীর লাইগ্যা? ও-অ-তোমরা বুঝি যশোর থাইক্যা ১৫৬ মাইল দৌড়াইয়া ভাগোয়াট হওনের গতিকে এই রকম লেড়-লেড়া হইয়া গেছো।

আহ্ হাঃ! তুমি একা খাড়াইয়া আছো কীর লাইগ্যা? কী কইল্যা? তুমি বুঝি মীরকাদিমের মাল? ও-অ-অ-অ বাকি হগ্গলগুলারে বুঝি বিচ্চুরা মেরামত করছে? গাংয়ের পাড়ে আলাদা না পাইয়া, আরামসে বুঝি চুবানি মারছে।

কেইসডা কী? আমাগো বকশি বাজারের ছক্কু মিয়া কান্দে কীর লাইগ্যা? ছক্কু-উ, ও ছক্কু! কান্দিস না ছক্কু, কান্দিস না! কইছিলাম না, বঙ্গাল মুলুকের কোদো আর প্যাঁকের মাইদ্দে মছুয়াগো মউত তেরা পুকর তা হ্যায়।

নাঃতখন কী চোট্পাট! হ্যান করেংগা, ত্যান করেংগা। আর অহন? অহন তো মওলবি সাবরা কপিকলের মাইদ্দে পড়ছে। সামনে বিচ্চু, পিছনে বিচ্চু, ডাইনে বিচ্চু, বাঁয়ে বিচ্চু। অহন খালি মছুয়ারা চিল্লাইতাছে, ‘ইডা হামি কী করছুনুরে! হামি ক্যা নানির বাড়িত আচ্ছিনু রে! হামি ইয়া কী করনু রে!

আত্কা আমাগো ছক্কু মিয়া কইল, ভাইসাব আমার বুকটা ফাইট্যা খালি কান্দন আইতাছে। ডাইনা মুড়া চাইয়া দেহেন। ওইগুলা কী খাড়াইয়া রইছে। কী লজ্জা! কী লজ্জা! মাথাডা অ্যাঙ্গেল কইরা তেরছি নজর মারতে দেহি কি, শও কয়েক মছুয়া অক্করে চাউয়ার বাপমানে কি না দিগম্বর সাধু হইয়া খাড়াইয়া রইছে। ব্রিগেডিয়া বশীর জিগাইলো, ‘তুম লোগেকা কাপড়া কিধার গিয়া?’ জবাব আইলোযশোরে সার্ট, মাগুরায় গেঞ্জি, গোয়ালন্দে ফুলপ্যান্ট আর আরিচায় আন্ডারওয়ার থুইয়া বাকি রাস্তা খালি চিল্লাইতে চিল্লাইতে আইছি, ‘হায়, ইয়াহিয়া, ইয়ে তুমনে কেয়া কিয়া?—হামলোগ তো আভি নাংগা মছুয়া বন গিয়া।

আত্কা ঠাস ঠাস কইরা আওয়াজ হইলো। ডরাইয়েন না, ডরাইয়েন না! মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী চুলে ভর্তি সিনা চাব্ড়াইতে শুরু করছে। পদ্মা নদীর কূলে আমার নানা মরেছে, পদ্মা নদীর কূলে আমার নানি মরেছেগাবুর বাড়ির চোটে আমার কাম সেরেছে।ব্যস, মওলবি রাও ফরমান আলী জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উথান্টের কাছে খবর পাডাইল, ‘হে প্রভু, তোমার দিলে যদি আমাগো লাইগ্যা কোনো রকম মহব্বত থাইক্যা থাকে, তা হইলে তুরন্দ আমাগো কইয়া দাও; কীভাবে বিচ্চু আর হিন্দুস্তানি ফোর্সের পা জাপটাইয়া ধরলে আমার লেডুলেড়া আর ধ্বজভঙ্গ মার্কা বাকি সোলজারগো জানডা বাঁচানো সম্ভব হইব।

এই খবর না পাইয়া একদিকে জেনারেল পিঁয়াজি আর একদিকে সেনাপতি ইয়াহিয়া কী রাগ? সেনাপতি ইয়াহিয়া লগে লগে উথান্টের কাছে টেলিগ্রাম করাল, ‘ভাই উথান্ট, ফরমাইন্যার মাথা খারাপ হওনের গতিকেই এই রকম কারবার করছে। হের টেলিগ্রামটা চাপিশ কইর্যা ফালাও।এইদিকে আমি ছ্যার শাহ নেওয়াজ ভুট্টোর ডাউটফুলপোলা, পোংটা সরদার জুলফিকার আলী ভুট্টোরে মিছা কথা কওনের ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করনের লাইগ্যা জাতিসংঘে পাডাইতাছি। পোলডারে একটুক্ নজরে রাখ্বা। বেডার আবার সাদা চামড়ার কসবিগো লগে এথি-ওথি কারবার করনের খুবই খায়েশ রইছে।

সাবে কইছে, কিসের ভাই, আহ্লাদের আর সীমা নাই। সেনাপতি ইয়াহিয়া খানের হবু ফরিন মিনিস্টার জুলফিকার আলী ভুট্টো ব্রাকেটে শপথ লওনের টাইম হয় নাইক্যাব্র্যাকেট শেষ। জাতিসংঘে যাইয়া পয়লা রিপোর্টারগো লগে বেশ কায়দা কইর্যা লুকোচুরি খেলতে শুরু করল। তারপর। জাতিসংঘের ডায়াসে আতকা কয়েক দফায় কান ধইর্যা উঠ-বস’, ‘উঠ-বসকইর্যা ভুট্টো সাবে ছিল্লাইয়া কইল, ‘আর লাইফের এই রকম কাম করুম না। বঙ্গাল মুলুকে আমরা গেন্জাম কইর্যা খুবই ভুল করছি। আমরা মাফ চাইতাছি, তোওবা করতাছি, কান ডলা খাইতাছি। আমাগো এইবারের মতো খেমা কইর্যা দেন।

কিন্তু ভুট্টো সাব। বহুত লেইট কইর্যা ফালাইছেন। এইসব ভোগাচ কাথাবার্তায় আর কাম হইব না। আতকা ঠাস ঠাস কইর্যা আওয়াজ হইল। কী হইল? কী হইল? জাতিসংঘে ভেটো মাইর্যা সোবিয়েত রাশিয়া হগ্গল মিচ্কি শয়তানরে চিত কইর্যা ফালাইছে। কইছে, ফাইজলামির আর জায়গা পাও না? বাঙালি পোলাপান বিচ্চুরা যহন লাড়াইতে ধনা-ধন্ জিত্তাছে, তহন বুঝি লাড়াই বন্ধু করনের নানা কিসিমের ট্রিকস হইতাছেনা?

এইদিকে সেনাপতি ইয়াহিয়া খানের পরানের পরান জানের জান চাচা নিক্সন, কড়া কিসিমের ট্রিক্স করনের লাইগ্যা সপ্তম নৌবহররে সিঙ্গাপুরে আনছে। লগে লগে ক্রেমলিন থাইক্যা হোয়াইট হাউসরে অ্যাডভাইসিং করছেএকটুক হিসাব কইর্যা কাজ কারবার কইরেন। প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি কইছে, ভারত উপমহাদেশে বাইরের কেউ নাক না গলালেই ভালো হয়। ব্যা-স-স, আমেরিকার সপ্তম নৌবহর সিঙ্গাপুরে আইস্যা নিল-ডাউন হইয়া রইল।

অ্যাঁ, অ্যাঁঃ! এই দিককার কারবার হুনছেননি? হারাধনের একটা ছেলে কান্দে ভেউ ভেউ, হেইডা গেল গাধার মাইদ্দে রইল না আর কেউ। জেনারেল পিঁয়াজি সাবে সরাবন তহুরা দিয়া গোসল কইর্যা ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের মাইদ্দে হান্দাইয়া এখনো চ্যাঁ চ্যাঁ করতাছে, ‘আমার ফোর্স ছেরাবেরা হইলে কী হইব, আমি পাইট করুমআমি পাইট করুম।

আমাগো মেরহামত মিয়া আতকা চিল্লাইয়া উঠল। এইডা কী? এইডা কী? জেনারেল পিঁয়াজি সাবের ফুল প্যান্টের দুই রকম রং দেখতাছি কীর লাইগ্যা? সামনের দিকে খাকি রং, পেছনের মুড়া বাসন্তী রংকেইসডা কী? অনেক দেমাক লাগাইলে এর মাজমাডা বোঝন যায়।
হেইর লাইগ্যা কইছিলাম। মেজিক কারবার। ঢাকায় অহন মেজিক কারবার চলতাছে। চাইরো মুড়ার থনে গাবুর বাড়ি আর কেচ্কা মাইর খাইয়া ভোমা ভোমা সাইজের মছুয়া সোলজারগুলা তেজগাঁ-কুর্মিটোলায় আইস্যাআঁ-আঁ-আঁ, দম ফাইলাইতাছে।

এম আর আখতার মুকুল: সাংবাদিক ও লেখক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত সাড়া জাগানো চরমপত্রঅনুষ্ঠানের পরিচালক, লেখক ও কথক ছিলেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s