রাজকীয় রূপের মথুরা -সৌরভ মাহমুদ

বিপন্ন পাখি মথুরার অনেক বাস্তব গল্প শুনিয়েছিলেন প্রকৃতিবিদ দ্বিজেনশর্মা। তাঁর ছেলেবেলায় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পাথারিয়া পাহাড় এলাকায়অনেক মথুরা পাখি নাকি চরে বেড়াত। দেশের পাহাড়ি বন এখন ধ্বংসের শেষপ্রান্তে। সঙ্গে যোগ হয়েছে পাহাড়িদের শিকার। দুয়ে মিলে মথুরা অনেক আগেই বনথেকে বিপন্ন পাখির তালিকায় চলে এসেছে। সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ে চা-বাগানসম্প্রসারণ আর প্রাকৃতিক বন উজাড় হওয়ার ফলে সেখানে চিরসবুজ বনের এ পাখিরদেখা পাওয়া এখন নিতান্ত ভাগ্যের ব্যাপার।

সম্প্রতি ঈদের ছুটিতে সেইপাথারিয়া এলাকার বন-জঙ্গলে আট দিন ঘুরেছি। ভাগ্য সহায় ছিল, দেখা হলো ১১টিমথুরা পাখির সঙ্গে। যাদের চারটি ছিল পুরুষ, সাতটি মেয়ে মথুরা। সবচেয়েউল্লেখযোগ্য সময় ছিল গত ২২ নভেম্বর বিকেলটা। ছয়টি মথুরার একটি দল একেবারেযেন রাজকীয় আড্ডায় বসেছিল আমার ক্যামেরার সামনে। হঠাৎ বাদামি কাঠবিড়ালি এসেশব্দ করায় ওরা লুকিয়ে পড়ল পাহাড়ি বনতলে।

পাখি পর্যবেক্ষকেরা সব সময়কোনো বিরল পাখির দর্শন পেলে আনন্দ পান। সেই হিসেবে ওই দিনটি আমার কাছে অনেকআনন্দের। পাখিগুলো এত বর্ণিল, এত সুন্দরযার ভাষিক বর্ণনা মুশকিলপ্রায়কাজ।

মথুরার বসবাস পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রায় দুই হাজার ৬০০ মিটারউচ্চতায়। নির্জন ঝোপময় পাহাড়ি টিলা, চা-বাগানেও এদের কদাচিৎ দেখা যায়।চিরসবুজ বনতলে এরা জোড়ায় কিংবা দলে চরে বেড়ায়। খুব সকালে আলো ফোটার আগে এবংসন্ধ্যার শেষ সময়ে মথুরা খাবার খেতে টিলার কোনো পরিষ্কার নির্জন জায়গায়বের হয়। মানুষের উপস্থিতি বিন্দুমাত্র টের পেলে মুহূর্তের মধ্যে লুকিয়েপড়ে। দুপুরের দিকে বনতলে বিশ্রাম নেয়। তাই পাখিটির দর্শন পাওয়া ও ছবি তোলাদুর্লভ ঘটনা।

মথুরার বৈজ্ঞানিক নাম Lophura leucomelanos, পরিবার Phasianidaeবাংলা ভাষায়ও কটি নাম আছেকালি মথুরা, কালি ময়ূর। চাকমাভাষীরাবলে সানগ্রু। খাসিয়া, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় যথাক্রমে খ্রুট, রই রাতা ওটকরু মূলত মথুরা-ই।

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার, আসামসীমান্তসংলগ্ন পাহাড় ও লাউয়াছড়া অরণ্য, হবিগঞ্জের রেমা কালেঙ্গা ও সাতছড়িবন এবং শেরপুরের গজনি বনে এদের দেখা যায়। তা ছাড়া ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, ভুটান, থাইল্যান্ড, তিব্বত ও মিয়ানমারেও আছে এদের উপস্থিতি।

বনের বটফল, বীজ, পোকামাকড়, ছোট সাপ ও গিরগিটি আছে এদের খাবারের তালিকায়। পাতা ও ময়লাঅবর্জনা দিয়ে বনের ঝোপে বাসা বাঁধে মার্চ থেকে অক্টোবরের মধ্যে। ছয় থেকেনয়টি ডিম দেয়। কদাচিৎ ছানাদের নিয়ে খোলা জায়গায় আসেএমন তথ্য দিয়েছেনপাহাড়িরা।

পুরুষ পাখি দেখতে নীলাভ কালচে। বুকের নিচে ও লেজের পালকেরকাছে সাদা পালক আছে। মেয়ে পাখিটি দেখতে ভারি সুন্দর। হালকা বাদামি ও ধূসরপালকের সে কী অপূর্ব বিন্যাস। উভয় পাখির মাথায় লম্বা পালকের ঝুঁটি আছে, যামথুরার সৌন্দর্যকে রাজকীয় রূপ দিয়েছে। চোখের চারপাশে লাল ত্বক আর লেজেরপালক লম্বা।

সুন্দর ও রাজকীয় স্বভাবের এ পাখিটিকে টিকিয়ে রাখা আমাদেরসবার কর্তব্য। শিকার বন্ধের জন্য বন্য প্রাণী আইনের বাস্তব প্রয়োগও অতিজরুরি।
সূত্রঃ প্রথম আলো; ২০-১২-২০১০
লেখকঃ সৌরভ মাহমুদ; বাংলাদেশের বিখ্যাত পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s